Time
Bangladesh Dhaka

12:21:16 PM

Australia Sydney

5:21:16 PM

Weather
Yahoo! Weather - Sydney Regional Office, AS


Current Conditions:
Mostly Cloudy, 24 Celsius
Currency Rate

Prayer Time
  • Fajr 4:41
  • Sunrise 6:14
  • Zuhr 1:09
  • Asr 4:53
  • Maghrib 8:02
  • Ishaa 9:31
Reader Number
           

আশীষ বাবলু
বৈশাখী মেলা ও একটি হলুদ ব্যাগের গল্প
লোক সমাগম দেখে বোঝা যায় জরুরি কারণ ছাড়া এই দিনটিতে অলিম্পিক পার্কে যেতে কেউ ভুল করে না। বৈশাখী মেলা এখন সিডনির বাঙ্গালীদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। এই ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে একদিন দৌড়েছে পৃথিবীর বাঘা বাঘা এ্যাথলেট। এখন তার উপর দিয়ে হাঁটছে সদলবলে বাংলার সন্তান। মাঠের পাশে যে বিশাল ইলেকট্রনিক ষ্কোর-বোর্ড তার উপর ফুটে উঠছে বাংলা বর্ণমালা। বুকে একটি কাপন লাগে বৈকি। শুধু দেহের সনে নয়, সত্যি তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে। শ্যামল বরণ, কত মুখ, হাসিমাখা মুখ, উজ্জল মুখ, পরিচিত মুখ, অপরিচিত মুখ, কোমল মূর্তিতে মুখরিত মেলা। আমি দূর থেকে লক্ষ্য করেছিলাম একটি ছেলেকে। সে বার বার ঘড়ি দেখছে এক কোণে দাঁড়িয়ে। বয়স ২০/২১ হবে। বেশ অস্থির। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে তবে জায়গা থেকে নড়ছে না। মনে হচ্ছে কাউকে কথা দিয়েছে এখানে অপেক্ষা করবে। কতদিন পর কত পরিচিত জনের সাথে দেখা হলো। সংসারের ব্যস্ততায় কত চেনা মানুষ হারিয়ে যায় আবার হঠাৎ করে খুঁজে পেয়ে বড় আনন্দ হয়। মেলার ভিড়ে শুধু হারিয়ে যাবার ভয় নয়, নতুন কাউকে খুঁজে পাবার আনন্দও আছে। কবেকার ভুলে যাওয়া আতসী ও যুথি। জীবনানন্দের স্টাইলে জিজ্ঞেস করতে হয়,- এতোদিন কোথায় ছিলেন? কথার ফাঁকে ফাঁকে আমার চোখ বার বার চলে যাচ্ছিল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির দিকে। ছেলেটি কার জন্য অপেক্ষা করছে? মনকে অযাচিত কৌতুহল দমাবার জন্য বারণ করতে পারছি না। আমার মনতো আর আমার নিজের কন্ট্রোলে নয়। মেলা কোথাও থেমে থাকে না। হাটে। আমাদেরও মেলার সাথে হাঁটতে হয়। ছেলেটি কিন্তু নড়ছে না। অসহায় চোখে একইভাবে দাঁড়িয়ে। প্রতিক্ষার যন্ত্রণা মানুষকে অসামাজিক করে দেয়। মেলায় তখন জনারণ্য। আমাদের সব অরণ্য হারালেও এই জনারণ্যটি এখনও অক্ষত আছে। বরং দিনে দিনে তার শাখা-প্রশাখা পল্লবীতে হচ্ছে। সুসজ্জিত কিছু মহিলার দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। শাড়ী, গহনা, প্রসাধনে কয়েকজন মহিলাকে মনে হচ্ছিল এক একটি বৈশাখী ঝড়। একজনকে দেখলাম এত গয়না পড়েছেন যে আসল মহিলাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলেরাও কম যায় না। কানে দুল পড়া এক ছেলে পড়েছে বেগুনি পাজামর উপর নকশা করা আকাশী পাঞ্জাবী। ভদ্রলোকের ড্রেসসেন্স একশতে হানড্রেড। পাঞ্জাবী কি দর্জির বানানো, না রেডিমেইড? একজন ফর্সা মহিলা চোখ বন্ধ করে কাবাব খাচ্ছেন। তার স্বামী ড্রিংকসের ক্যান খুলে পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। কখন মুখের কাবাব শেষ হবে তারপর স্ত্রী চোখ খুলবেন এবং স্বামীর হাত থেকে ক্যানটা নিয়ে ঠান্ডা কোক গলাতে ঢালবেন। আহা কি মধুর ভালবাসা। দৃশ্যটা একটা জমজমাট কোকের বিজ্ঞাপন হতে পারে। আমি এখন অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। তখনও ব্যান্ড সঙ্গীত তাদের জীবনমুখি গান শুরু করেনি। আমার পেছনে গার্মেন্টস এর দোকান। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সেই এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি দোকান থেকে একটা কিছু কিনছে। দূর থেকে মনে হয়েছিল ছেলেটির বয়স ২০/২২ হবে। এখন মনে হলো ১৭/১৮। গোঁফের রেখা হালকা। ব্লেডের স্পর্শ ওতে খুব একটা লাগেনি। জিন্সের উপর টি-শার্ট। চুল ছোট। নাম্বার টু কোট। চোখ দুটো উজ্জল ও গভীর। এমন চোখ তুলে কেউ শক্ত কথা বলতে পারে না। ছেলেটি দোকান থেকে একটা হলুদ সিল্কের ব্যাগ কিনে ছুটে চলে গেলো এবং আবার গিয়ে দাঁড়ালো সেই এক কোণে। ছেলেটি কার জন্য ব্যাগ কিনেছে? আবার এসব চিন্তা? ওর যার জন্য ইচ্ছা তার জন্য ব্যাগ কিনেছে। ওরে মন, কেন সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চাস? ছেড়ে দে মন কেঁদে বাঁচি, আর না। সব জীবনই বিন্দু বিন্দু কান্না। এমন জমজমাট মেলা উপভোগ না করে একটি অপরিচিত ছেলে কার জন্য ব্যাগ কিনেছে সে চিন্তায় আমি উদ্বিগ্ন। নিজের গালেই কসে একটা চড় দিতে ইচ্ছে করছে। সময় যাচ্ছে হু হু করে। থামা চলবে না, দৌড়াতে না পারো হাঁটো। খাবারের দোকানের পাশে চলে এসেছি। সামনে পেছনে ডাইনে বায়ে বিভিন্ন খাবার। বাঙ্গালীদের মধ্যে বড় খাই খাই স্বভাব। জীবনের সব আনন্দের প্রকাশ খাওয়া ও খাওয়ানোর মধ্যে। আমি ঝালমুড়ি কিনলাম। মেলা এখন পৌছেছে পূর্ণ জীবনে। ভীড় কাকে বলে। ভীড়ের ধাক্কায় সাধের মুড়ি হাত থেকে ছিটকে পড়লো। দোষ দেবো কাকে। ভীড়ের তো ধাক্কা দেবার জন্মগত অধিকার। শাহরুখ খানকে ভীড়ের ধাক্কা খেতে হয়। আমিতো পাল বংশের হরিদাশ। সেই কাবাব খাওয়া, ফর্সা মহিলাটিকে আবার দেখলাম। এবার আইসক্রিম হাতে। তবে এবার তিনি খাচ্ছেন না। স্বামীর সাথে একটা আইসক্রিম উঁচিয়ে ঝগড়া করছেন। একঘন্টা আগে মহিলাটিকে মনে হচ্ছিল স্বামীটির পছন্দের ‘মেহবুবা’ আর এখন মনে হচ্ছে শুধু মেহবুবা নয় ‘মারদাঙ্গা মেহবুবা’। স্বামী বেচারা পাশে সপিং ব্যাগ হাতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে ভদ্রলোককে সান্তনা দিয়ে বলি- দুঃখ করবেন না, মাথা নামিয়ে থাকার জন্য লজ্জা পাবার কিছু নেই। ভালবাসার সামনে অমিতাভ বচ্চনকেও সিনেমায় মাথা নিচু করে থাকতে দেখেছি। একটা অট্টহাসির শব্দ কানে আসে। সানগ্লাস পড়া একজন উঠতি নেতা কয়েকজন চামচা সমেত গর্বিত পদভারে বেপরোয়া হাঁটছে। দূর্বল শরীরের দুই একজন ধাক্কা খেয়ে তাল সামলাতে ব্যস্ত। নেতা হতে চলেছেন অথচ জনসাধারণের মাঝে হাঁটাও শেখেনি। নিয়ম হচ্ছে- এমনভাবে হেঁটো না যাতে সবাই ভাবে তুমি মহল্লার মাতব্বর। এমনভাবে হাঁটো যাতে বোঝা যায় তুমি মাতব্বরের পরোয়া করো না। এইভাবে নানা স্মৃতি পকেটে পুরে আমি মেলার সাথে হাঁটছি। আলোতে আলোতে কথাতে কথাতে সমস্ত অলিম্পিক পার্কে নেমে এসেছে উৎসব। ভাবলাম একটা কিছু খাওয়া দরকার। খালি পেটে কালচার হয় না। দাঁড়ালাম বিরিয়ানীর লাইনে। মাঝরি লম্বা লাইন। কিন্তু এগোচ্ছে না। এগোবে কি? লাইন ব্রেক করে অস্থির চিত্তের মানুষেরা খাবার কিনছে। প্রায় কুড়ি মিনিট অপেক্ষার পর যখন দোকানের নাগালের মধ্যে এসেছি একজন ভদ্রলোক ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরিয়ে দিলেন। পঞ্চাশ ডলারের একটা নোট উঁচিয়ে ধরে দোকনিকে বললেন- তিনটে বিরিয়ানী। আমি ভদ্রলোকের অভদ্রতার প্রতিবাদ করতে তার মুখের দিকে তাকালাম। কিন্তু চেহারা দেখে কিছু বলার সাহস হলো না। ভদ্রলোক দৈর্ঘ্যে প্রস্থে প্রায় সমান। চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর তাবৎ সমস্যা তিনি একা সামাল দিচ্ছেন। পাশে তার স্ত্রী। তবে এককালে সুন্দরী ছিলেন। রোগা। নির্বিকার মুখ। এসব মুখ দেখে বোঝা যায় না ভাল আছেন না মন্দ আছেন। বনলতা তুমি বদলে গেছো। মহিলার পাশে তাদের কিশোরী কন্যা। হাতে হলুদ সিল্কের ব্যাগ। এটা কি সেই ব্যাগ যা আমি সেই ছেলেটার হাতে দেখেছিলাম? মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম। সমস্ত মুখে যেন রূপকথা লেগে আছে। ফুল-ফুল জামা গায়ে হলুদ ব্যাগটি শক্ত করে বুকের কাছে ধরা। মনে হচ্ছিল হলুদ ফুলে রং লেগেছে গায়ে। মেয়েটি মুখ টিপে হাসছে। বিরিয়ানীর দোকানে দাঁড়িয়ে কী কেউ হাসে? এই হাসির উৎস কোথায়? আশেপাশে চোখ ফেরালাম। যা ভেবেছিলাম তাই। একটু দূরে সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে দেখছে মেয়েটিকে। সলজ্জে দাঁড়িয়ে আছে দূরে ভালবাসা। মনে হচ্ছিল সমস্ত অলিম্পিক ভিলেজের গাছগুলো ভরে গেছে নতুন পাতায়। বাতাস অধীর, পাতা ঝির ঝির, প্রজাপতি ওড়ে নাকি? এই বৈশাখে মিষ্টি একটা স্মৃতি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। জানি সব সবুজ চিরদিন সবুজ থাকে না। তবু এমন ভালবাসার জোরেই পৃথিবীতে কিছু সবুজ এখনো অবশিষ্ট আছে।